আজ ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

এখনো আইন প্রণয়ন করে ইসি গঠন সম্ভব-বদিউল আলম মজুমদার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, সেই স্বাধীনতা ঘোষণার লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হয়, যে প্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থে এবং কল্যাণে কাজ করবেন। নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি সঠিক না হয় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব না করেন, তাহলে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

নির্বাচন মানেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, যেটা মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং যাতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবার যথার্থ ভূমিকা থাকবে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ রয়েছে। সবচেয়ে বড় স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ হলো নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ হয়, স্বাধীন হয় এবং শক্তিশালী ও কার্যকর হয়, তাহলে তারা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। যেহেতু নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাই তারা যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে, সে জন্য সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের বাইরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ হলো সরকার। আর সরকার মানেই প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। তারা যদি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ আচরণ না করে, তাহলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এরপর রয়েছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী। তাদেরও সদাচরণ করা দরকার। তারা যদি সদাচরণ করে, তাহলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম হয়। কিন্তু তারা যদি বদ্ধপরিকর হয় যে সহিংসতা করবে, বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হবে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। এর বাইরে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ হচ্ছে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম। তারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নির্বাচন কমিশন। এটি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বময় ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তাই নির্বাচন কমিশনে সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ পাওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে। দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে সংবিধান বর্ণিত আইনটি প্রণীত হয়নি, নির্বাচন কমিশনও সাংবিধানিক নির্দেশনার আলোকে গঠিত হয়নি। গত দুটি নির্বাচন কমিশন, অর্থাৎ ২০১২ সালে রকিবউদ্দীন কমিশন এবং ২০১৭ সালে নুরুল হুদা কমিশন গঠিত হয়েছে রাষ্ট্রপতির সংলাপ, দুটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন এবং অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে। আমি মনে করি, এই দুটি কমিশনেরই পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ এবং জালিয়াতির নির্বাচনে সায় দেওয়ার কারণে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাই এখন ধ্বংস হয়ে গেছে, আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউ দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। তাই আমাদের নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করা দরকার এবং একই সঙ্গে যাঁরা তাঁদের নিয়োগ করেছেন তাঁরাও দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নন। এখন আমাদের যদি ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনে সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমেই তা করতে হবে। আর নির্বাচনের নামে যারা অপকর্ম করেছে, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, দায়বদ্ধতার আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে। নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি আবারও পুরনো পথে হাঁটছেন এবং তিনি সংলাপের আয়োজন করছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংলাপ, আলোচনা ও সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে যে সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে, আমরা মনে করি না এর মাধ্যমে কোনো ইতিবাচক ফল আমরা পাব। কারণ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশেই সিদ্ধান্ত নেন। আমাদের গত দুটি নির্বাচন কমিশন এভাবেই গঠিত হয়েছে, যাদের পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এখন একই পদ্ধতি যদি অবলম্বন করা হয়, তাহলে এর চেয়ে ভালো কিছু আমরা আশা করতে পারি না। কারণ আগে যেসব কমিশন গঠিত হয়েছে সেগুলোতে সংলাপের ব্যবস্থা থাকলেও তা ছিল নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা।

আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপতি যে সংলাপের ডাক দিয়েছেন, এতে ভালো কিছু তো হবেই না, এর সঙ্গে সঠিক ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের কোনো সম্পর্কও নেই। অতীতে যেমন নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন, এবারও তাই হবে। এর বাইরে কিছু আশা করা যায় না। তবে সংলাপে রাজনীতিবিদদের জন্য ফটোসেশনের সুযোগ, বঙ্গভবনে আপ্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে এবং তাঁদের কথাবার্তা মিডিয়ায় আসার সুযোগ মিলবে। এর বাইরে কোনো সম্ভাবনা আমরা দেখি না।

তাই আমরা মনে করি, সংবিধানে যেহেতু নির্দেশনা দেওয়া আছে যে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, তাই আমাদের একটি আইন প্রণয়ন করা জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গত ৫০ বছরে কোনো সরকারই আইনটি করেনি। আমরা বহুদিন ধরে এই আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে এলেও এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে আমরা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি আইনের খসড়া আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রীর কাছে দিয়েছি। তখন আইনমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন যে তাঁরাও একটি আইনের খসড়া তৈরি করছেন। তবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, এই আইন প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট সময় সরকারের হাতে নেই। কিন্তু এটি একটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ আইন, তিন-চার পৃষ্ঠার একটা আইন। ড. শামসুল হুদা কমিশনও এসংক্রান্ত একটা খসড়া রেখে গিয়েছিল। সব একত্র করে একটি চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করে অধ্যাদেশ আকারে জারি করে এটা বলবৎ এবং পরে তা সংসদে অনুমোদন করা যেতে পারে। কিন্তু সরকার আইন করার এই ঝুঁকিটা নিতে রাজি নয়, বরং পুরনো পরীক্ষিত পথেই হাঁটতে চায়, যে পরীক্ষিত পথে তাদের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া যাবে।

তবে আইন করলেই যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে তা হলফ করে বলা যায় না। কিন্তু আইনের মাধ্যমে কিছু বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। আইনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া তৈরি করা যায়, যাতে সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ পাওয়ার পথ সুগম হয়। যেমন—আমরা যে আইনের প্রস্তাব করেছিলাম, তাতে কমিশনে কারা নিয়োগ পাবেন, তাঁদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠিগুলো সুস্পষ্ট করা হয়েছে। কারা নিয়োগ পাবেন না, তা-ও বলা হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের প্রস্তাবে আমরা একটি অনুসন্ধান কমিটির প্রস্তাব করেছিলাম। এ কমিটিতে আমরা তিনজন সংসদ সদস্য রাখার প্রস্তাব করেছি। তিনজন সংসদ সদস্যের মধ্যে একজন হবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত, আরেকজন হবেন বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত এবং তৃতীয় জন হবেন সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধি। একই সঙ্গে একজন করে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাবও আমরা করেছি।

আমাদের প্রস্তাবে রয়েছে, এই অনুসন্ধান কমিটি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করবে। যেমন—কমিটি যাঁদের নিয়োগের জন্য বিবেচনা করবে তাঁদের নাম প্রকাশ করবে, যাতে জনগণ জানতে পারে কোন ধরনের ব্যক্তিদের কমিটি বিবেচনায় নিচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য লোকদের সম্পর্কে কারো যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা প্রকাশ হওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হবে। আমরা প্রস্তাব করেছি যে কমিটি তাঁদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করবে, তাঁদের ইন্টারভিউ করবে, হলফনামা আকারে তাঁদের তথ্য নেবে এবং তা প্রকাশ করবে। তাঁদের ব্যাপারে গণশুনানি করবে। চূড়ান্ত ধাপে কমিটি যাঁদের নামগুলো সুপারিশ করবে রাষ্ট্রপতির কাছে, সেই ব্যক্তিদের কোন যুক্তিতে ও কোন যোগ্যতার বলে সুপারিশ করা হয়েছে, এই মর্মে একটি প্রতিবেদন সুপারিশের সঙ্গে যুক্ত এবং তা প্রকাশ করা হবে, যাতে সবাই জানতে পারে। রাষ্ট্রপতি সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জনগণকে অবগত হওয়ার জন্য জন্য কয়েক দিন সময় দেবেন, যাতে তাঁদের সম্পর্কে কোনো রকম অভিযোগ থাকলে আরেক দফা প্রকাশের সুযোগ মেলে। পরে রাষ্ট্রপতি সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবেন।

এভাবে একটা পদ্ধতি অনুসরণ করে সঠিক ব্যক্তিদের স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তাব করেছি। আমরা মনে করি, সংবিধান মেনে এভাবে যদি একটি আইন প্রণয়ন করা হয় এবং আইনি ধারাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, তাহলে একটি উপযুক্ত নির্বাচন কমিশন পাওয়ার পথ সুগম হবে। কিন্তু যে অনুসন্ধান কমিটি রাষ্ট্রপতি অতীতে করেছিলেন তা সংবিধানে নেই, এটা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ সংবিধানে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেওয়ার জন্য আইন করার নির্দেশনাই দেওয়া আছে। আমরা মনে করি যে একটি আইন করার এখনো সময় আছে। আইন করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া এখনো সম্ভব। এর মাধ্যমে যে নির্বাচন ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে, সেটিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ হবে এবং আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে। এটাই ছিল আমাদের প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য।

লেখক : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

Comments are closed.

     এই ক্যাটাগরিতে আরো সংবাদ