আজ ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

প্রতীক্ষা-সুলেখা আক্তার শান্তা

ডেস্ক:
শিলা আর লোপা দুই বোন। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। মমতাময়ী ফুপু এগিয়ে আসে, অনাথ দুবোনকে লালন পালনের দায়িত্ব নেয়। শিলা-লোপার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দিয়ে ফুপু তাদের দেখা শোনা করে। শিলা বয়স দশ লোপার বারো। ফুপু জলি আদরে যত্নে দুবোনেকে মা বাবার অভাব পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। জলি ছেলেকে বিয়ে করাবে বিভিন্ন জায়গায় মেয়ে দেখে। ফজিলা বলি বলি করে একদিন কথাটা বলে। হাতের কাছে মেয়ে থাকতে এতো খোঁজা খুঁজি করছো কেন?
হাতের কাছে মেয়ে দেখলা কোথায় তুমি?
কেন তোমার ভাইয়ের দুমেয়ে শিলা আর লোপা।
ওরা তো ছোট! আমার ছেলের চেয়ে বয়স ওদের অনেক কম।
তাতে কি! মেয়ে মানুষ কয়দিন লাগকবে বড় হইতে। লাউয়ের ডগার মতো বড় হইয়া যাইবো। জলি একটু থম ধরে বলে, তুমি ভালো কথাই বলেছো। দেখি চিন্তা ভাবনা করে।
আর ভাবনা চিন্তার দরকার নাই। ওদের মাও তুমি ফুপুও তুমি। যা করা দরকার তোমাকেই করতে হবে। জলি ছেলের সঙ্গে কথা বলে। ছেলের মত জানতে চায়।
মা আমি আর কি বলবো। আলিম বলে, আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করেন। শিলাকে আপনি ছেলের বউ করতে পারেন। জলি দ্বিধায় পড়ে যায়। বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ের বিয়ে। ছেলের তো মত-অমতের বিষয় আছে। ছেলে যার কথা বলে তার সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করি। নয় যদি ছেলে বেঁকে বসে। জলি ছেলের সঙ্গে শিলার বিয়ে দেয়। উপযুক্ত পাত্র দেখে লোপারও বিয়ে দেয়। লোপা মাঝে মাঝে ফুপুর বাড়ি বেড়াতে আসে। বোনে বোনে খুব মিল। জলি হাপছাড়ে ভাইঝীদের বিয়ের দায়িত্ব পালন করতে পেরে। শিলা স্বভাবে বালিকা বধূ। স্বামীর প্রতি তার কোন খেয়াল নাই। সে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গীদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকে। স্বামী আলিম কাছে ডাকলে ফিরেও তাকায় না। আলিম কান ধরে বলে, খেলা করতে পারিস এখানে সেখানে ছুটে বেড়াতে পারিস। আমি ডাকলে শুনিস না কেন?
শিলা চিৎকার করতে করতে ফুপুর কাছে এসে বলে। ফুপু তোমার ছেলেকে ভাত দিবানা! আমার কান ধরে মেরেছে।
আচ্ছা মা, ওরা আজকে ভাত বন্ধ। শিলা সবার সঙ্গে হাসে আনন্দ করে। কিন্তু আলিমকে দেখলে মুখে আর হাসি থাকে না।
আলিমের ভাবনা এ নিয়ে সংসার হবে না। আমার কোন কথাই শোনে না। আলিম রিনার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। জলি এ ব্যাপার নিয়ে ছেলের সঙ্গে রাগারাগি করে। আলিমের অভিযোগ, স্বামী হিসেবে আমারে মান্য করে না, আমার কথা শোনে না। সংসার কি একটা খেলনা, আমি ওকে নিয়ে খেলা করতে বসেছি?
ও ছোটো অতশত বুঝেনা। তাই বলে তুই কি অবুঝ! আলিম কাউকে কিছু না বলে রিনাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। জলি উচ্চস্বরে চিৎকার করে, হায় হায়রে, এ তুই কি করলি। শিলার এত বড় সর্বনাশ করলি! এদিকে শিলার স্বামীর এই ব্যাপার নিয়ে কোন উদ্বেগ নাই। আলিম আর রিনা সুন্দর সংসার করে। শিলার একটাই ভাবনা ফুপু তার আপনজন। ফুপুর ভালোবাসা থাকলে আর কিছুর দরকার নাই। কিছু খেলার সঙ্গী আছে তারা থাকলেই হবে। শিলা হঠাৎ বমি করে। ব্যাপারটা নজরে পড়ে ফুপু জলির। লক্ষণ দেখে জলি বুঝে নেয় শিলার গর্ভধারণ করেছে। জলি খুব উৎফুল্ল হয়ে ছেলেকে সুসংবাদ জানায়। কিন্তু এই খবর রিনার জন্য দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়ায়। রিনা তার সংসারে ভাগিদার বসাতে চায়না। সে শিলাকে বলে, তোমাকে নিয়ে স্বামী সংসার করতে চায়না। সে আমাকে বিয়ে করেছে, আমাকে নিয়ে সংসার করবে। রিনা শাশুড়ি জলিকে বলে, ছেলের সুখ চাইলে শিলার থেকে তালাকের ব্যবস্থা করেন। জলির অন্তর কেঁপে ওঠে। আমি বাইচা থাকতে এমন ইচ্ছা কারো পূরণ হবে না। শিলাকে আমি পুত্রবধূ করেছি। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা দাম নাই। তুমি আইছো একা আর শিলাকে আমরা পাঁচজন মিলে বিয়ে করেছি। ও ছোট, আর বোঝে না বলেই তোমাকে বিয়ে করতে পেরেছে। না হয় চোখের সামনে স্বামীকে বিয়ে করতে দেয় অন্য কাউকে।
আপনার ভাইয়ের মেয়ে বলে সাফাই গেয়ে যান।
ভাইয়ের মেয়ে বলেই তুই সংসার করতে পারছো। শিলার জায়গায় অন্য মেয়ে হলে পারতানা সংসার করতে।
শিলা আস্তে আস্তে স্বামী সংসার কি বুঝতে পারে। সে এখন নিজের সংসার পেতে চায়। একটু একটু করে তার মনে হিংসার জন্ম নেয়। দেখে স্বামীকে সে আপন করে পায়না। আলিম ছোট বউ রিনার সঙ্গে সংসারের যাবতীয় বিষয় আলাপচারিতা করে। শিলার মনে করে সে এই সংসারের কেউ না। সে এই সংসারে পরগাছা। বুঝে বাচ্চা গর্ভে থাকাকালীন যে যত্ন পাওয়া দরকার সেটা সে পাচ্ছে না। বোন লোপাকে সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে।
লোপা বলে, যেখানে স্বামীর কাছে তোর কদর নেই সেখানে পেটের বাচ্চা রেখে কি করবি?
বোনের অপ্রত্যাশিত কোথায় আহত হয় শিলা। বলে, বুবু এ তুমি কি বলো? কে ভালোবাসলো না বাসলো তার জন্য আমার সন্তান পৃথিবীতে আসতে দেবো না! এত আমারই রক্ত মাংসের গড়া একটা জীবন। আমি আমার সন্তানকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখাবো। শিলা ছোট হলেও বোঝে একটা জীবন হত্যা করা ঠিক না।
কিছুদিন রোগে ভুগে জলির মৃত্যু হয়। শিলার পক্ষে কথা বলার মানুষটি জীবিত নেই। এই সুযোগে রিনা সংসারের পুরো কর্তৃত্ব তার হাতের মুঠে নেয়। স্বামী-সংসার এখন তার। স্বামী আলিমের আশকারায় বাড়তে থাকে রিনার বাহাদুরি। রিনা খোঁচা মারে যেখানে স্ত্রীর মর্যাদা একমাত্র আমাকেই দেয় সেখানে অন্য কেউ ঘর সংসার না করলেই পারে। কিসের আশায় পড়ে থাকা এখানে!
শিলা সন্তান জন্মের আগে থেকেই স্বামীর অধিকার বঞ্চিত। সেই সঙ্গে পৃথিবীতে আসা সন্তানও তার বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। স্বামী তার সন্তানকে দু’চোখ দিয়ে দেখে নাই। সন্তান প্রসবের পর তার কপালে জুটে পানি ভাত আর শুকনো মরিচ। তা খেয়েই সন্তুষ্ট। দুঃখের কথা বলার মতো তার কোন জায়গায় নাই। জীবন বুঝে ওঠার আগেই বাল্যবিবাহে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। মনের দুঃখে কষ্টে কাউকে কিছু না বলে সন্তান নিয়ে ঢাকায় চলে আসে শিলা। ভাগ্য একটু প্রসন্ন হয়। আশ্রয় পায় সহানুভূতিশীল মাতৃ হৃদয়ের অধিকারী মমতার বাসায়। মমতা মেয়েদেরকে সেলাই কাজ, বুটিক বাটিক, পার্লারের কাজ বিভিন্ন বিষয় প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের প্রচেষ্টায় ভাগ্য সহায়ক হয়। কয়েকবছর পর একটি শোরুমে মালিক হয়। বেশ ভালো আয় হয়। শিলা বেশ টাকার মালিক হয়। রুবেল শিলার শোরুমে ম্যানেজারের দায়িত্বে কর্মরত। একসময় শিলার টাকা দেখে রুবেলের লোভ জাগে। রুবেলে ভাবে শিলার কেউ নেই। পড়ালেখাও জানেনা। হিসাব নিকাশ যা বুঝাই তাই বুঝে। শিলার সহজ সরলতাকে রুবেল কাজে লাগায়। ভালোবাসার প্রস্তাব দেয় শিলাকে।
প্রথমে না বলে। রুবেল না মানলে, শিলা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য কারণ হিসেবে যুক্তি দেখায়, আমার বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা আছে।
আমিতো সব জেনেই বলছি।
শিলা ভাবে আমার বিয়ে হয়েছে ঠিক। স্বামী কি জিনিস তখন তা আমি বুঝিনি। আমি তার কাছ থেকে স্ত্রীর মর্যাদাটুকু পাইনি। আমার অপূর্ণ জীবনে পূর্ণ করতে রুবেলকে দরকার। শিলা রুবেলের প্রেমে মজে যায়। সে রুবেলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে সংসার করার। রুবেল কাজী ডেকে নিজের কয়েকজন বন্ধু হাজির রেখে শিলাকে বিয়ে করে। শিলা রুবেলের যেখানে যা দরকার সবকিছুই বহন করে সে।
শিলা রুবেলের পরিবারের কাউকে চিনেনা। বিয়ের দুই বছরের মাথায় শিলা বলে রুবেলকে, তোমার পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। রুবেলের উত্তর, আমিতো আছি পরিবারের লোকজনদের কি দরকার?
আমার যেমন তোমাকে দরকার তেমনি তোমার পরিবারকেও দরকার। রুবেল শিলাকে একথা সেকথা বলে বুঝদিয়ে দেয়। শিলা সে বুঝ নিলেও তার মনে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেন রুবেল তার পরিবারকে সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় না। কেন এবুঝ সেবুঝ দিয়ে এড়িয়ে যায়। শিলার মেয়ে তানিশা সেভেনে পড়ে। মাকে বলে, মা তোমার স্বামী অধিকারের লড়াই আমাকে খুব কষ্ট দেয়। শিলা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ভাবে জীবনের গতি প্রকৃতি কখন কি রকম হয় তা কেউ জানে না। রুবেল টয়লেটে থাকায় ফোন বারে বারে বাজতে থাকে। শিলা ফোন ধরে। ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে বলে, তুমি পাঁচটার দিকে বসুন্ধরা শপিংমলে থাকবে। আজ আমরা মুভি দেখব, খাব। এমন কথা শুনে শিলার বুক কেঁপে ওঠে। শিলা কোন কথা না বলে ফোন রাখে। রুবেলকে কিছু বুঝতে দেয় না। শিলা পাঁচটার সময় হাজির হয় বসুন্ধরা শপিং মলে। দেখে রুবেল আর মেয়েটি দু’জন দু’জনকে ধরে খুব হাসাহাসি করে। রুবেল মেয়েরটিকে নীলা নামে ডাকে। রুবেল নিলার হাতে ব্রেসলেট পরিয়ে দেয়। এমন দৃশ্য দেখে শিলার অন্তর হিংসায় জ্বলে ওঠে। শিলা বাসায় আসে। রুবেলের জন্য টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখে। রুবেলকে খেয়ে নিতে বলে।
আমার ক্ষুধা নেই।
ক্ষুধা নাই নাকি খেয়ে এসেছো?
মানে?
যার হাতে ব্রেসলেট পরিয়ে দিলে!
তুমি জানলে কি করে?
ইচ্ছে থাকলে জানা যায়।
আসলেই ও আমার কেউ না। ওর নাম নীলা। ও একটা সমস্যায় পড়েছে। সেটা বলার জন্য আমার সঙ্গে দেখা করেছে।
আমি কিছু শুনতে চাই না। তোমরা যদি সম্পর্কে এগিয়ে থাকো ওখানেই থেমে যাও। এরপর রুবেল প্রায়ই বাসায় আসেনা। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। শিলা লক্ষ্য করে রুবেল তাকে সময় দেয় না তার কাছ থেকে দূরে থাকে। শিলা স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন টিকিয়ে রাখতে পারছে না। কয়েকবছর পার হলেও রুবেল ঘরে তার সন্তান নাই। সে বান্ধবী শারমিনের সঙ্গে রুবেলের বিষয় আলাপ করে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে রুবেলের সন্তান ধারণ করো, শারমিন পরামর্শ দেয়। বলবা তোমার গর্ভে সন্তান। শিলা শারমিনের কথামতো রুবেলের কাছে তাই বলে। আমার গর্ভে তোমার সন্তান। কথাটা শুনে রুবেল বিগড়ে যায়। রুবেল অস্বীকার করে। পরিষ্কার জানিয়ে দেয় আমি তোমার সঙ্গে থাকবোনা। বাসা ছেড়ে চলে যায় সে। শিলা হতাশ হয়ে পড়ে। শারমিন সান্তনা দেয়, সন্তান নিয়ে যখন দাঁড়াবা তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
শারমিন আর শিলা মিলে একজন ধাত্রী মহিলাকে ঠিক করে। একটি সন্তানের ব্যবস্থা করে দিতে। ধাত্রীর চাহিদা মত টাকা দিতে রাজি হয়। গর্ভধারণের দিন মাস হিসাব করে শিলার কোলে একটি সদ্যজাত শিশুকে তুলে দেয় ধাত্রী।
শিলা সন্তান নিয়ে রুবেলের সামনে দাঁড়ায়। রুবেলের এক কথা এ সন্তান আমার না।
এ সন্তান তোমার।
তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা করাব। সন্তান নিয়েও রুবেলকে মায়ার বাঁধনে আটকাতে পারে না। রুবেল সংসার করে নীলাকে নিয়ে। শিলা সংসার ঘিরে আছে মেয়ে তানিশা আর ছেলে রাতুল। এদের ঘিরেই তার ভালোবাসা। রাতুলকে কোলে তুলে বলে, ভেবেছিলাম তোকে নিয়ে হয়তো রুবেলের ভালোবাসা পাবো। আমার সংসার করার সাধ পূর্ণ হবে। তা আর ইহজনমে হবে না। তোরা দুটি সন্তান আমার আশার আলো বেঁচে থাকার অবলম্বন। রাতুল তোর সঙ্গে আমার রক্তসম্পর্কের নাই তারপরও তুই আমার সন্তান আমি তোর মা। রাতুল আস্তে আস্তে বড় হয়। মেয়ে তানিশাকে বিয়ে দেয়। অনেক ভালো মনের জামাই পায়। শিলা ছেলে মেয়ে আর জামাই নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। শিলার নেই আর দুঃখ কষ্ট।

Comments are closed.

     এই ক্যাটাগরিতে আরো সংবাদ