প্রিন্ট এর তারিখঃ জানুয়ারী ১৬, ২০২৬, ১২:৫৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ২০, ২০২৫, ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

মনের যত কথা আছে সব নাজমাকে বলতে হবে। নাজমা তার ভালো বন্ধু। কলেজে কোন মেয়েকে নাহিদের ভালো লাগে বা লাগে না, সবই সে নাজমাকে বলে। কিন্তু নাহিদের কোনো মেয়েকে বেশি দিন ভালো লাগে না। মেয়েরা তাকে ভালোবাসলেও সে তাদের ভালোবাসে না।
নাজমা নাহিদকে বোঝায়, তুই আমার ভালো বন্ধু। তোর দ্বারা কারো খারাপ হোক, এটা আমি চাই না। মেয়েকে ভালোবাসবি, ভালোবাসার কথা বলবি, তার সাথে চলাফেরা করবি, আবার তাকে অন্য কারো সাথে কথা বলতে দিবি না, এটা কি ভালোবাসা না? এটা কি প্রেম না?
নাহিদ বলে, আমি কোনো মেয়েকে প্রেম করে তাকে জীবনসঙ্গী করব, সংসার করব, তা কখনো ভাবি না।
নাজমা বিরক্ত হয়ে বলে, তাহলে প্রেমের প্রস্তাব দিস কেন? যখন সত্যিই কারো জন্য তোর হৃদয়ে ভালোবাসা জাগবে, তখনই প্রস্তাব দিস। এর আগে আমার কাছে এসে ঘ্যানরঘ্যানর করবি না।
নাহিদ বলে, এই কথা বলিস না! তোর কাছে কোনো কথা না বলে থাকতে পারি না। শোন ক্লাস শেষ হলে যাওয়ার পথে কথা বলবো।
নাহিদ ক্লাস শেষ করে বাড়ি আসে। তার ছোট বোন উর্মি কে সে খুব ভালোবাসে। কলেজ থেকে ফিরেই বোনকে জড়িয়ে ধরে।
উর্মি বলে, ভাইয়া, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো?
নাহিদ উত্তর দেয়, তোকে কতটা ভালোবাসি সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। সেই মাপকাঠি আমার কাছে নেই। এই যে বুকটা দেখছিস? এখানে শুধু তুই, আমার ছোট বোন টি।
উর্মি অবাক হয়ে বলে, তুমি আমাকে এত ভালোবাসো?
নাহিদ হেসে বলে, হ্যাঁ, তোকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি। নে, তোর জন্য ফুল নিয়ে এসেছি।
উর্মি খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভাইয়া, তুমি সবসময় আমার জন্য ফুল আনো কেন?
নাহিদ উত্তর দেয়, ফুল তুই ভালোবাসিস তাই। শোন, তোকে আমি বেশ কিছু ফুলের গাছ কিনে দেব।
উর্মি বলে, ঠিক আছে ভাইয়া, দিও।
নাহিদ সতর্ক করে, তবে পড়াশোনাও ঠিক মতো করতে হবে।
উর্মি আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলে, ভাইয়া, আমার পড়াশোনার বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে হয়?
নাহিদ হেসে বলে, না, তোকে পড়াশোনা করতে বলতে হয় না। তুই নিজেই পড়িস।
নাজমার জন্মদিনের পার্টিতে আসে হীরা। হীরা নাজমার ছোটবেলার বান্ধবী। দুই বান্ধবী একে অপরকে পেয়ে খুব আনন্দিত হয়! কেক কাটার মুহূর্তে হাজির হয় নাহিদ। হীরাকে দেখে নাহিদ বলে, আমি কী দেখলাম! আমার পুরো হৃদয় জুড়িয়ে গেল। নিজে থেকেই নাহিদ হীরার সঙ্গে পরিচিত হয়। তখন নাজমা নাহিদের শার্ট ধরে টেনে নিয়ে যায় রুমে। নাজমা বলে, শোন নাহিদ, যেটুকু পরিচয় হয়েছে, ওটুকুই থাক। সামনে আর বাড়াস না।
নাহিদ অবাক হয়ে বলে, তুই কী বলিস! তুই তো আমার ভালো বন্ধু। সব ব্যাপারে সহযোগিতা করবি, তা না করে আমাকে বাধা দিচ্ছিস? আমার যে ওকে ভালো লেগেছে!
নাজমা দৃঢ়ভাবে উত্তর দেয়, হীরা আমার ছোটবেলার বান্ধবী। আর পাঁচটা মেয়ের মতো ওর সাথে তেমন কর আমি চাই না।
নাহিদ কিছুটা নরম হয়ে বলে, আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর কথা শুনবো। তবে আমার একটু কথা বলাতে যদি ও প্রেমে পড়ে যায়, সেটা নিয়ে আমাকে দোষ দিস না।
নাজমা কঠিন গলায় বলে, তোর ওর সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। এখন বাড়ি ভরা মেহমান। এই মুহূর্তে আর কথা বলতে চাই না এই বিষয় নিয়ে।
পরে নাজমা হীরাকে আলাদা করে সতর্ক করে দেয়, হীরা, যেমন তুই আমার বান্ধবী, নাহিদও আমার ভালো বন্ধু। তোদের যদি কোনো দুঃখ দেখি, সেটা আমার ভালো লাগবে না। নাহিদ যদি তোর সাথে কথা বলতে চায়, তুই একটু এড়িয়ে চলিস।
হীরা কোনো উত্তর দিল না।
নাজমার কোনো বাধা-নিষেধ মানলো না হীরা। সে রীতিমতো নাহিদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
নাহিদ হীরাকে বলল, হীরা, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
হীরা তো ভীষণ খুশি! নাহিদ তার সঙ্গে দেখা করতে চায়, এটা ভেবে সে রাজি হয়ে গেল। তারা দেখা করল, কথা বলল। একসময় নাহিদ প্রেমের প্রস্তাব দিলো হীরাকে। হীরা রাজি হয়ে গেল। দু’জনের দেখা-সাক্ষাৎ আর কথাবার্তা চলতে থাকল নিয়মিত।
হীরা নাহিদের প্রেমে পড়ার পর তার চোখে নাহিদের কোনো দোষই ধরা পড়ল না। সে মনে মনে ভাবল, নাজমা আমাকে কেন নিষেধ করেছিল নাহিদের সঙ্গে কথা বলতে! নাহিদ তো খারাপ নয়। নাকি নাজমা চায়নি আমার নাহিদের সঙ্গে সম্পর্ক হোক! যাই হোক, নাহিদ আমাকে ভালোবাসে, প্রচণ্ড ভালোবাসে। ও তো আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।
নাহিদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে। সে এখন নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করছে। ব্যবসার ব্যস্ততায় নাহিদ হীরার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, দেখা করতেও পারে না। কিন্তু হীরা অস্থির হয়ে ছুটে আসে নাহিদের অফিসে। সে বলে, নাহিদ, তুমি ব্যস্ত ঠিক আছে, কিন্তু তুমি কি একটু ফোন করেও আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো না?
নাহিদ বিরক্ত স্বরে উত্তর দেয়, ও হীরা, আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত। এখন তোমার সঙ্গে দেখা বা কথা বলার সময় নেই।
হীরা আবেগে বলে, তাহলে নাহিদ, তুমি আমাকে বিয়ে করো। যখন আমি তোমার স্ত্রী হবো, তখন দিনে না পেলেও রাতে তো তোমাকে পাবো? তখন আর এই হতাশা থাকবে না, তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না, কথা বলতে পারছি না। তখন যদি তোমাকে না-ও পাই, তবুও তুমি আমার স্বামী হিসেবে ফিরে আসবে। এটা আমার মনে সান্ত্বনা দেবে। এখন তো আমরা দু’জন দুই প্রান্তে!
নাহিদ বিরক্ত নিয়ে বলে, ও হীরা, চুপ থাকো। তোমার এইসব কথা আমার বিরক্ত লাগছে।
হীরা কষ্ট পেয়ে বলে, আমার কথা তোমার বিরক্ত লাগছে? দেখো না, আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে!
নাহিদ কঠিন গলায় উত্তর দেয়, আমার কত কাজ আছে দেখছো না? যখন তখন আমাকে ফোন দিও না, আর আমার অফিসেও এসো না। হীরা কষ্টভরা গলায় বলে, আমি তোমাকে ফোনও দেব না, তোমার অফিসে ও আসব না? নাহিদ, তুমি এত বদলে গেলে কেন?
নাহিদ ঠান্ডা স্বরে উত্তর দেয়, তোমাকে নাজমা বলেনি? আমি কোনো মেয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক করি না।
হীরা ক্ষোভে বলে, সম্পর্ক করো না মানে! সম্পর্ক করে একটা মেয়েকে ছুড়ে ফেলে দাও? নাহিদ দৃঢ়ভাবে বলে, দেখো হীরা, তোমার মতো অনেকেই আমার জীবনে এসেছে। কিন্তু কাউকে আমি বিয়ে করবো, সংসার করবো, তাকে নিয়ে এটা আমি কখনো ভাবি না! আমি শুধু তোমাকে নিয়ে কয়েকটা দিন ঘুরছি-ফিরছি, ওই পর্যন্তই। আমার আর তোমার সঙ্গে দেখা করা বা কথা বলা সম্ভব নয়। হীরা তখনই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, নাহিদ, তুমি আমার জীবনটা নিয়ে খেলো না। আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি! তোমাকে ছাড়া আমার জীবন চলবে না!
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলে, দেখো হীরা, এইসব নাটক-সিনেমার কাহিনী বাদ দাও। এখন তুমি বাসায় যাও।
হীরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাসায় ফিরে এসে ভাবে, আমি কীভাবে নাহিদকে ছেড়ে থাকবো? আমার কোনোভাবেই সম্ভব নয় নাহিদকে ছাড়া বেঁচে থাকা।
হীরা খুব পাগলামি করতে থাকে। নাহিদ ফোন দেয় না, আর হীরা ফোন দিলেও ধরে না। কোনো কিছু না ভেবে সে ছুটে যায় নাহিদের অফিসে। কিন্তু সেখানে নাহিদের সঙ্গে দেখা হয় না। অফিসে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। দারোয়ান তার অনুনয়-বিনয় কোনোভাবেই শোনে না।
হতাশ হয়ে হীরা চলে আসে নাজমার বাসায়। নাজমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। নাজমা অবাক হয়ে বলে, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?
হীরা সব খুলে বলে নাজমাকে।
সব শুনে নাজমা রেগে যায়! আমি তোকে আগেই বলেছিলাম, নাহিদকে এড়িয়ে চলতে। হীরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে উত্তর দেয়, আমি তখন বুঝতে পারিনি। নাহিদ আমার জন্য কতটা পাগলামি করছে! তা শুধু আমি জানি।
নাজমা বলে, ও সবার জন্যই পাগলামি করে, কিন্তু কাউকে ভালোবাসে না। এরপর নাজমা হীরার ব্যাপারে নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু নাহিদ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আমি হীরাকে চাই না। আর তুইও হীরার ব্যাপারে আমার কাছে ওকালতি করতে আসিস না। তুই তো জানিস আমি কেমন?
নাজমা ক্ষোভে বলে, হ্যাঁ, জানি। তাই বলে তুই মেয়েদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলবি? নাহিদ এক কথায় উত্তর দেয়, হীরা যেন কোনোভাবেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করে।
নাহিদের এই সিদ্ধান্ত হীরা মেনে নিতে পারে না। বাসায় ফিরে সে ছাদ থেকে লাফ দেয়। তড়িঘড়ি করে তার বাবা-মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হীরা প্রাণে বেঁচে যায়, কিন্তু এক হাত ও এক পা অকার্য হয়ে যায়! এরপর থেকে বিছানায় শুয়েই তার দিন কাটতে থাকে।
নাহিদের বোন উর্মি একটি ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক করে। একসময় সেই ছেলেটি তাকে অস্বীকার করে। উর্মিকে সে ভালোবাসে না, আর বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু উর্মি তা মেনে নিতে পারে না।
উর্মি বারবার হাজির হয় তার ভালোবাসার মানুষ ফয়সালের কাছে। ফয়সাল তাকে এড়িয়ে চলে। উর্মি অনুনয় করে বলে, ফয়সাল, তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
ফয়সাল কঠিন গলায় উত্তর দেয়, উর্মি, আমি তোমাকে কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারবো না। আমার বাবা-মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। তাদেরকে অমান্য করা সম্ভব নয়। আমিও সেই বিয়েতে মত দিয়েছি। আমার সাথে সম্পর্ক করার আগে তুমি বাবা-মার কথা ভাবোনি? এখন কেন সম্পর্ক করে বাবা-মার কথা ভাবছো? উর্মি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, তোমাকে না পেলে আমি এই জীবন রাখব না।
ফয়সাল বিরক্ত হয়ে বলে, উর্মি, তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো? ভয় দেখিয়ে কোনো কাজ হবে না। আমার বিয়ে যেখানে ঠিক হয়েছে, সেখানে তুমি আর আমার কাছে এসো না।
ফয়সালের পা জড়িয়ে ধরে বলে উর্মি, ফয়সাল, তুমি এ বিয়ে ভেঙে দাও।
ফয়সাল চিৎকার করে ওঠে, কী! আমি বিয়ে ভেঙে দেবো? তোমার কোনো কান্নাকাটি আমার মন গলাতে পারবে না। আমার বাবা-মার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। তুমি এখান থেকে চলে যাও।
উর্মি ফিরে এসে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। বাসায় কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়। নাহিদ ভেঙে পড়ে বলে, আমার আদরের বোন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল!
বোনের দাফন-কাফন শেষ হলে নাহিদ ভীষণ অনুতপ্ত হয়। সে ভাবে, আমি যেমন অন্য মেয়েদের জীবন নিয়ে খেলেছি, তেমনি আমার বোনের জীবন নিয়েও অন্য খেললো!
নাহিদ ফিরে যায় হীরার কাছে। সে অনুতপ্ত কণ্ঠে বলে, হীরা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
হীরা দৃঢ়ভাবে উত্তর দেয়, না নাহিদ, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই না। যখন তোমাকে চেয়েছিলাম, তখন তুমি আমাকে চাওনি। এখন আমার এই পঙ্গু জীবন নিয়ে আমি কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। তুমি তোমার জীবন নিয়ে থাকো, আর আমাকে আমার জীবন নিয়ে থাকতে দাও।
নাহিদ গভীরভাবে বলে, জানো হীরা, নিজের পাপ নিজেকেই ধ্বংস করে! অন্য কারো ধ্বংস করার দরকার হয় না। আমি যেমন মেয়েদের জীবন নিয়ে খেলেছি, তেমনি আমার বোনকে নিয়ে অন্য কেউ খেলেছে। যে যেমন কাজ করবে, তার জীবনে তেমনি বদলার দাম পেতে হবে। আমি যেমন অন্যকে কাঁদিয়েছি, তেমনি আমাকেও কাঁদতে হলো! পাপ করলে তার কর্মফল তো পেতেই হয়। আমি সেই প্রতিফলই পেয়েছি।