
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি : জাতীয় পার্টির একাংশের (আনিস মাহমুদ) এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
তার মনোনয়নপত্রে দলের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর না থাকায় ও ঋণ খেলাপির দায়ে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-১,২ ও ৩ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই বাছাই করা হয়। এর আগে শনিবার ছিল কিশোরগঞ্জ-৪, ৫ ও ৬ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই।
মুজিবুল হক চুন্নু কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, জামায়াতের প্রার্থী ডা. কর্নেল (অব) জেহাদ খান ও লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের) প্রার্থী হিসেবে আবু বকর সিদ্দিকের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
রোববার জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সকাল ১০থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার নেতৃত্বে চলে এ যাচাইবাছাইয়ের কাজ।
জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের আটটি মামলা থাকায় তিনি জনরোষের ভয়ে যাচাই-বাছাইয়ে উপস্থিত থাকেননি। তবে তাঁর প্রস্তাবক উপস্থিত ছিলেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, মুজিবুল হক চুন্নুর হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া দলীয় মনোনয়নপত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর ছিল না। এছাড়াও রুপালি ব্যাংকের ঋণ খেলাপের তথ্য তিনি গোপন করেছেন । হলফনামায় তিনি সম্পদের সঠিক তথ্য জমা দেননি। এসব কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
যাচাইবাছাইয়ের দ্বিতীয় দিনে মুজিবুল হক চুন্নু ছাড়াও তিন আসনের মোট ৩২জন প্রার্থীর মধ্যে ১৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ১৮ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। বাতিল প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই স্বতন্ত্রপ্রার্থী। তাদের
মনোনয়নপত্র বাতিলের পেছনে শতকরা একভাগ ভোটারের স্বাক্ষরের গরমিল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া কয়েকজন প্রার্থীর সম্পদের হিসাব, হলফনামায় ত্রুটি ও মামলার তথ্য গোপন ও ঋণ খেলাপির কারণ দেখানো হয়।
কিশোরগঞ্জ ১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে বিএনপি’র চার বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। তারা হলেন- জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু, জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল হোসাইন ও কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল।
নির্বাচনের নিয়ম হলো স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে সমর্থক হিসেবে শতকরা একভাগ ভোটারের নাম ও সই জমা দিতে হয়। বিএনপি’র বিদ্রোহী এই তিন প্রার্থীর এক শতাংশ সমর্থকের ভোটের তথ্য সঠিক না থাকায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
তবে এই আসনে বিএনপির আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মো: মাসুদ হিলালীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-১ ( সদর- হোসেনপুর) আসনে প্রার্থী ছিলেন মোট ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। এ আসনে মনোনয়ন বাতিল হওয়া অন্য তিনজন প্রার্থী হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আজিজুর রহমান জার্মানি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের হেদায়াতুল্লাহ হাদী ও খেলাফত মজলিসের আহমদ আলী।
মনোনয়ন ফরম সঠিকভাবে পূরণ না করায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
এ আসনে বিএনপিপ্রার্থী মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জামায়াত প্রার্থী মোসাদ্দেক ভূঞা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির( এনপিপি) তারেক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, স্বতন্ত্রপ্রার্থী ( বিএনপি বিদ্রোহী) সাবেক সাংসদ মো. মাসুদ হিলালী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মো. এনামুল হক, বাসদের (মার্কসবাদী) আলাল মিয়া ও বাসদের মো. মাসুদ মিয়ার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
কিশোরগঞ্জ-২ ( পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের ( বিএনএফ) মো. বিল্লাল হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী নূর উদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবুল বাসার রেজওয়ান ও গণ অধিকার পরিষদের মো. শফিকুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
তাছাড়া এ আসনে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন, স্বতন্ত্রপ্রার্থী সাবেক এমপি মো. আনিসুজ্জামান খোকন, জাতীয় পার্টির মো. আফজাল হোসেন ভূঁইয়া, জামায়াতের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মো. শাহরিয়ার জামানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। এ আসনে মোট ৯জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
কিশোরগঞ্জ-৩ ( করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে মোট ১০জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তারা হলেন, জাতীয় পার্টির একাংশের নেতা মুজিবুল হক চুন্নু, গণতন্ত্রী পার্টির দিলোয়ার হোসাইন ভূঁইয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী একেএম আলমগীর ও স্বতন্ত্রপ্রার্থী ( বিএনপি বিদ্রোহী) জাহাঙ্গীর আলম মোল্লার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
এ আসনে যাদের মনোনয়নপত্র গৃহীত হয়েছে, তারা হলেন, বিএনপি প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, জামায়াতের প্রার্থী ডা. জেহাদ খান, জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের) প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক,ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আতাউর রহমান শাহান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আলমগীর হোসাইন।
এর আগে শনিবার কিশোরগঞ্জ-৪, ৫ ও ৬ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন ২৯ প্রার্থীর মধ্যে ১০জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। সবমিলিয়ে দুদিনে ৬১ প্রার্থীর মধ্যে ২৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে মোট ৩৭জনের মনোনয়নপত্র।
কিশোরগঞ্জে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় জেলার পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, সংশ্লিষ্ট আসনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন।