Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the insert-headers-and-footers domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/pratidinsangbad2/public_html/wp-includes/functions.php on line 6121
ভালোবাসি হয়নি বলা – সুলেখা আক্তার শান্তা – Pratidin Sangbad

ভালোবাসি হয়নি বলা – সুলেখা আক্তার শান্তা

                              ভালোবাসি হয়নি বলা-সুলেখা আক্তার শান্তা
মার্কেটের সামনে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল রুবেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আড্ডায় যোগ দিলো ফয়সাল।
ফয়সাল বলল, রুবেল, মার্কেটের ভিতরে গন্ডগোল হচ্ছে!
রুবেল তখন সিগারেট ধরাচ্ছিল। আগুন ধরিয়ে বলল,
কিসের গন্ডগোল?
ফয়সাল জানাল, একটা মেয়ে দোকানে মাল দিয়েছে। দোকানদার টাকা দিচ্ছে না, ছয় মাস ধরে শুধু ঘুরাচ্ছে।
রুবেল হাতের সিগারেটটা ফেলে বলল, আগে বললি না কেন? মেয়েমানুষের সাথে গন্ডগোল—এটা আমার ভালো লাগে না। চল, দেখি কী হয়েছে।
দোকানে গিয়ে দেখে ভিড় জমে আছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে রুবেল দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
মোকলেস বলল, ভাই, বইলেন না! এই মেয়ে মাল দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু টাকার জন্য আমার সাথে যা-তা ব্যবহার করছে। আমি কি টাকা নিয়ে পালাই যাইতেছি? বলেছি দেব, কয়েকটা দিন সবুর করতে। কে শুনে কার কথা!
এর মধ্যে মলি বলে উঠল, কয়েকটা দিন? ছয় মাস ধরে আমাকে ঘুরাচ্ছে!
মোকলেস মলিকে থামাতে গিয়ে বলল, তুমি চুপ! ভাইয়ের সাথে কথা বলি। তারপর মোকলেস বলল রুবেলকে, দেখেন না ভাই, আপনার সাথে তো কথা বলেছি! তাও বলতে পারিনা।
রুবেল মোকলেসকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তাকে কথা বলতে দিন। বলুন, কী হয়েছে?
মলি বলল, সে আমাকে টাকা দেয় না, শুধু এলেই নতুন তারিখ দেয়।
মোকলেস সাফাই দিতে চায়, ভাই, বেচাকেনা নাই। টাকা দিমু কী দিয়া? তাই একটু সময় নিচ্ছিলাম।
রুবেল কঠিন গলায় বলল, একটু সময়? ছয় মাস ধরে সময় নিচ্ছেন আপনি! এটা ব্যবসা! ওনার চলতে হয়। যত দ্রুত সম্ভব, এক টাকাও বাকি না রেখে কয়েক দিনের মধ্যে টাকা দেবেন।
মোকলেস মুখ গোমরা করে বলল, ভাই, এত চাপ দিলে হবে না। আমাকে সময় দিতে হবে।
রুবেল ধমকে উঠল, শুনেন, সময় কারো হাতে থাকে না; সময় থেকে সময় বের করতে হয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।
মোকলেস মলির দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল, দেখি, আমার সাথে এমন ব্যবহার? সে এই মার্কেটে মাল দেয় কীভাবে, তা আমি দেখে ছাড়ব!
এই কথা শুনেই রুবেল ঝাঁপিয়ে পড়ে মোকলেসের উপর। শার্টের কলার ধরে বলল, ওনাকে কী বললেন? আবার বলুন তো!
মোকলেস ভয়ে বলল, ভাই, কলার ছাড়েন… আমার একটা সম্মান তো আছে!
রুবেল বলল, আপনার এই আচরণে মার্কেটের মানুষ আপনাকে কী সম্মান দেবে? মেয়েটার টাকা আটকে রাখবেন, আবার ধমকও দিবেন? এত সাহস আসে কোথা থেকে?
এই মার্কেটে সবাই স্বাধীনভাবে চলবে। ওকে আপনি চোখ রাঙিয়ে কথা বললে খবর আছে, বুঝছেন?
মোকলেস ভয়ে বলল, ভাই, আপনি এসবের মধ্যে আসেন কেন?
রুবেল তৎক্ষণাৎ বলল, আমি আসি কেন মানে? মেয়েমানুষ দেখলেই ক্ষমতা দেখাতে ইচ্ছে করে? ক্ষমতা দেখাতে হলে দেখাবেন পুরুষের সঙ্গে—মেয়েদের সঙ্গে নয়।
মোকলেস মুখ মলিন করে বলল, ঠিক আছে ভাই… ঠিক আছে। কালকেই ওর টাকা আপনার হাতে দিয়ে দেব।
আমার হাতে নয়, যার টাকা তার হাতেই দিবেন। আর যেন একটাও অভিযোগ না শুনি।
আচ্ছা ভাইয়া… আচ্ছা।
রুবেল তখন মলিকে বলল, শুনলেন তো? কালকে আপনার হাতেই টাকা দিয়ে দেবে। আর যদি না দেয়, আমাকে জানাবেন।
মলি মাথা নাড়ল, আচ্ছা, ঠিক আছে।
পরের দিন মোকলেস মার্কেটে মলিকে পেয়ে বলল, এই নেন আপনার টাকা।
মলি টাকা হাতে পেয়েই হেসে বলল, ঠেলার নাম বাবাজি।
মার্কেটের কাজ সেরে বের হওয়ার সময় মলি দেখল রুবেল মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মলি এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনাকে খুঁজছিলাম।
রুবেল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?
মলি হালকা হাসল, ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
রুবেল ভ্রু তুলল, ধন্যবাদ?
মলি বলল, ধন্যবাদ পেয়ে এমন চমকে উঠলেন যে!
রুবেল হেসে বলল, আপনি ধন্যবাদ দিলেন বলেই তো চমকালাম।
মলি বলল, আমি টাকার জন্য অনেকদিন ধরে ঘুরছিলাম। কিছুতেই ওনার কাছ থেকে তুলতে পারছিলাম না। অবশেষে আপনার জন্য আজ হাতে পেলাম টাকা। তাই আপনাকে ধন্যবাদ দিতে এলাম।
রুবেল মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা, আচ্ছা… কিন্তু ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। এটা আপনার প্রাপ্য টাকা। প্রাপ্য টাকা পাওয়া উচিত।
আর কখনো কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবেন।
মলি নরম স্বরে বলল, ঠিক আছে, বলব।
মলি মার্কেটে আসা–যাওয়ার পথে রুবেলকে দেখলেও তেমন কথা বলত না।
একদিন সামনে গিয়ে বলল, কেমন আছেন?
রুবেল হেসে, এই তো ভালো। আপনি?
ভালো… আপনার সাথে কথা বলি বলি করেও আর বলা হয় না, মলি লজ্জায় হেসে বলল।
রুবেল জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা… এমনি কোনো সমস্যা নেই তো?
না না, সমস্যা নেই। এভাবেই দু’জনের মাঝে মাঝে ছোটখাটো কথা হতো।
একদিন মলি জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনি সবসময় এরকম ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটান কেন?
রুবেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার কোনো কিছু করতে ভালো লাগে না। তাই বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটাই।
মলি বলল, কিছু একটা করলেও তো পারেন। তাছাড়া মার্কেটে আপনাদের নিজস্ব দোকান আছে, তার একটাতেই বসতে পারেন।
রুবেল হালকা হাসল, হ্যাঁ, পারি। কিন্তু বাবা বলেছে—‘বাড়ি আমি করেছি, দোকানপাট আমি করেছি। তুমি যদি নিজ উদ্যোগে কিছু করতে পারো, করো।’ আর আমি চাকরি করব কারো আন্ডারে এটা আমার ভালো লাগে না!
মলি বলল, আপনি নিজের উদ্যোগে একটা দোকান নিয়ে বসেন। রুবেল বলে, কিন্তু আমার হাতে কোনো টাকা নেই। আমি টাকা দেব আপনাকে। রুবেল মাথা ঝাকিয়ে বলল, না না, আপনি টাকা দিবেন কেন? আপনার নিজ ব্যবসা শুরু করতে যে পুঁজি লাগে, তা আমি দেব।
রুবেল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি সত্যিই বলছেন?
হ্যাঁ, সত্যি বলছি।
তবে একটা ব্যবসা শুরু করতে অনেক টাকা লাগে।
সেই ব্যবস্থা আমি করব। সেটা নিয়ে আপনি ভাববেন না।
পরবর্তীতে রুবেল মার্কেটে একটি মোবাইলের দোকান নিয়ে বসে। সেখানে অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। মলির ব্যবসার যত টাকা ছিল, সবই সে রুবেলকে দিলো। তাও যথেষ্ট হলো না। তখন মলি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে রুবেলকে টাকা দিলো। কিন্তু মলি ব্যাংকের লোন নেওয়ার কথা রুবেলকে জানায়নি।
রুবেলের ব্যবসা ভালো জমজমাট হয়ে ওঠে। মলির প্রতি সে খুবই সন্তুষ্ট, কারণ এই ব্যবসার পেছনে মলির অবদান খুব বড়!
এদিকে মলি ব্যাংকের লোন টানতে হাঁপিয়ে উঠছে। যে টাকার মলি বাসা ভাড়া করে থাকত, পরে তার থেকেও ছোট একটা বাসায় থাকতে হচ্ছে। কিন্তু রুবেল এসব বিষয়ে কোন কিছু জানেনা।।
একদিন রুবেল মলিকে রেস্টুরেন্টে ডিনারে দাওয়াত দেয়। প্রথমে মলি রাজি হয়নি। কিন্তু রুবেলের এক কথা—আমি না শুনতে চাই না।—মলি রাজি হয়।
রেস্টুরেন্টে পৌঁছে মলি রুবেলের কিছু বন্ধুকে দেখে অবাক হয়! টেবিলে রাখা কেক। দেখে বলে, কেক!
রুবেল মলির দিকে তাকিয়ে বলল, আজ আমার জন্মদিন! এই জন্মদিনে আমি চাই আমার আপনজন থাকুক। আর এখানে তুমি আমার আপনজন। এবং আপনজন ছাড়া কি উদযাপন হয়?
মলি চমকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি আপনার আপনজন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি আমার আপনজন।
যেখানে আগে দু’জন ‘আপনি’ সম্বোধনে কথা বলত, এবার সেই ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ হয়ে গেল। মনে মনে মলি ভাবল, আমি রুবেলের আপনজন… আর ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’!
সবাই একসাথে কেক কাটল। প্রথমে রুবেল মলির মুখে কেক দিলো। মলিও রুবেলের মুখে কেক দিলো। খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসায় ফেরার পালা। মলির বাসার গেটে এসে নামিয়ে দেয় রুবেল।
রুবেলের ব্যবসা অনেক বড় হয়েছে! মলি এ নিয়ে খুবই আনন্দিত। আজ রুবেল নিজে পায়ে দাঁড়াতে পারছে—এটাই মলির সার্থক। যে মানুষ আগে শুধু ঘুরেফিরে সময় কাটাত, আজ তার ব্যবসা চলছে।
রুবেল নিজের উদ্যোগেই মলিকে ফোন করে খোঁজ খবর নেয়—ঠিকমতো খেলো কিনা, কাজ কেমন চলছে, কোথায় আছে। রুবেলের এমন খোঁজ খবর নেওয়ায় মলির মন আনন্দে ভরে ওঠে। মলি অনুপ্রেরণা পায়।
একদিন মলি দেখে রাস্তায় রুবেল একটি মেয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি শাড়ি পরে আছে এবং দেখতে বেশ সুন্দরী! মলির হৃদয়টা কেঁপে ওঠে। ভেবে নেয়, এটা হয়তো রুবেলের কেউ হবে। মলি রুবেলকে ফোন দেয়, কিন্তু রুবেল ফোন রিসিভ করেন না।
কাজ শেষে মলি রুবেলের দোকানে যায়। রুবেল তাকে দেখে বলল,
আরে, মলি তুমি?
না, এমনি আসলাম।
বসো, ভিতরে বসো।
না, বসব না।
ভাবলাম তোমার সাথে একটু দেখা করি।
তুমি আমার সাথে দেখা করতে এসেছো এটা আমার বেশ ভালো লাগছে।
মলি হেসে বলল,
তোমার ভালো লেগেছে?
হ্যাঁ, ভালো লেগেছে। চলো আমরা রেস্টুরেন্টে যাই।
না না, যাব না।
তোমার না শুনে কে? আমি যেটা বলছি, সেটাই হবে।
দু’জন রেস্টুরেন্টে যায়। বসে খাওয়া-দাওয়া করে, গল্প করে। মলি মুগ্ধ হয়ে রুবেলের দিকে তাকায়।
কি তাকিয়ে আছে যে?
মলি লজ্জায় মাথা লুকায়।
আরে না, লজ্জা পেতে হবে না, এদিকে তাকাও। আমাকে দেখছ দেখো ভালো করে। মলি আরো লজ্জা পেয়ে যায়। তখন রুবেল মলির হাত ধরে বলল, চলো, চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাসায় পৌঁছে দেই।
মলিকে বাসায় পৌঁছে দেয় রুবেল।
হঠাৎ মলি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে বাসা থেকে বের হয় না। রুবেলও মোবাইলে ফোন করেনা। মলি ভাবল, রুবেল হয়তো ব্যস্ত, তাই আমাকে ফোন দিচ্ছেনা।
এদিকে রুবেলের বন্ধু ফয়সাল মলিকে ফোন দেয়। মলি ফোন রিসিভ করে। ফয়সাল সরাসরি জিজ্ঞেস করল, মলি, আপনি বিয়েতে আসবেন না?
মলি অবাক হয়ে বলল, বিয়ে? কার বিয়ে?
ফয়সাল বলল, আজ তো রুবেলের বিয়ে! অনেক বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে হচ্ছে, কিন্তু আপনাকে তো দেখি না।
মলির চেহারায় হতাশার ছায়া এসে পড়ল। রুবেলের বিয়ে?
হ্যাঁ, রুবেলের বিয়ে, ফয়সাল নিশ্চিত করে বলল। মলি সঙ্গে সঙ্গে রুবেলকে ফোন দেয়। কিন্তু রুবেল ফোন রিসিভ করেন না। বারবার ফোন দিতে থাকে, কিন্তু রিসিভ হয় না। পরে মোবাইলটা বন্ধ পায়। দিন যখন রাত হয়ে যায়, মলি আবার ফোনে চেষ্টা করে। শেষমেষ ফোন খোলা পায়। ফোন রিসিভ হয়। কন্ঠ শুনে মলির মনে এক ধাক্কা লাগে—চমকে উঠে! ভয়, বিস্ময় আর হতাশার মিশ্রণ। মলি জিজ্ঞেস করে, কে… আপনি? ফোনের অন্য পাশে ধ্বনিটি জানালো, আমি রুবেলের স্ত্রী!
মলি স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারল না। মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল কেটে দিলো মলি।
কিছুক্ষণ পরে মলি আবার ফোন দেয়। এবার রুবেল ফোন ধরল। মলি মোবাইল বুকে ধরে হালকা শ্বাস ফেলল।
রুবেল বলল, হ্যালো… হ্যালো…। ফোনের অপর প্রান্তে থেকে রুবেলের স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, কে ফোন দিয়েছে?
রুবেল ঘাড় নাড়িয়ে উত্তর দিল,
জানি না, কে যেন আমার কাছে…টাকা সাহায্য চায়।
ও আচ্ছা।
মেয়ের কন্ঠ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মলির হৃদয় ভেঙে পড়ল।
যাকে সে এতদিন টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে, আজ সেই রুবেলের কাছে, টাকা না চেয়েও, টাকা চাওয়া আলা হয়ে গেলো।
মলির চোখে পানি এলো। মনে হলো, হায়রে দুনিয়া, হায়রে মানুষ। এই কি মানুষের মনুষ্যত্ব, এই কি বিবেক!